ঢাকা ০৭:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ধারাবাহিক গল্প।

গল্পঃ- ‘কন্যার বিবাহ’ – ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন। পর্ব – ৪ || দৈনিক নয়ালোক

SRI Bonsai
  • আপডেট সময় : ১০:৩৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০২৩
  • / ৫১৪৪ বার পড়া হয়েছে

“কন্যার বিবাহ”

রচনাঃ- ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন।

“চতুর্থ খন্ড”

হিকমত সাহেব মেয়ের বিয়েতে কোনো কিছুর ঘাটতি রাখতে নারাজ। ছেলে হিরণ্ময়কে বাড়ি সাজসজ্জার দায়িত্ব দিয়েছেন। হিরণ্ময় তার দায়িত্বের বিন্দুমাত্র অবহেলা করছে না। বন্ধু বান্ধব ও কাজিনরা মিলে সর্বক্ষণ এজেন্সির কাজ নিখুঁত ভাবে হচ্ছে কিনা তদারকি করছে।

সাত তলা ভবনের পুরো ভবন ও মহল্লার মেইন রোডের মোড় থেকে বাড়ির গেট পর্যন্ত মরিচ বাতির রংবেরং এর আলো দিয়ে সাজিয়েছে। ফুল, গাছের ডালপালা আর কৃত্রিম আলোয় দারুণ চাকচিক্যময় গেট তৈরি করা হয়েছে। হিরণ্ময়ী যে গাড়ি চরে বিউটি পার্লার হয়ে কমিউনিটি সেন্টারে আসবে সেই গাড়িও তাজা ফুলে সাজানো হয়েছে।

শহরের নামকরা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকেই আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে পাত্রী পক্ষের লোকজনের সংখ্যাই বেশি। তন্ময়, তিন্নীসহ সব বন্ধু বান্ধবীরা যথা সময়ে হাজির। হীরক তার মা বাবাসহ এসেছে। হিরণ্ময়ীর কথা মত পায়জামা পাঞ্জাবি পড়েছে, দেখতে বরের মতোই লাগছে। মাথায় পাগড়ি পড়িয়ে দিলে যে কেউ জামাই ভেবে ভুল করবে নিশ্চিত।

কমিউনিটি সেন্টারের গেট থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে বলে ,”বরের গাড়ি এসেছে….” তরুণ তরুণীদের মধ্যে একটা আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। সবাই দৌড়ে গেটের সামনে চলে আসে। হিরণ্ময় বন্ধু বান্ধবী আর কাজিনদের নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়ায়। তন্ময়, তিন্নী ও হীরকসহ হিরণ্ময়ীর বন্ধুরা পেছনের সারিতে দাঁড়ায়। দুইজন দুই পাশে একটা লালা ফিতা ধরে গেট আঁটকে রাখে। একজন একটা ট্রেতে মিষ্টি আর সিজার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

হিরণ্ময়ীর বাবা এগিয়ে গিয়ে আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণি বরকে গাড়ি থেকে নামান। বর লোভাতুর রহমান লোভী গাড়ি থেকে নেমে চারিদিকে একবার তাকান, সামনে একটি পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভরকে যান। “চোরের মন পুলিশ পুলিশ” বলে একটা প্রবাদ আছে ঠিক এই মুহূর্তে সেই রকম কিছুই যেন বর লোভীর মনে খেলা করে। যৌতুক নেয়া মে রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী সেটা মাথায় আসে।

বর প্রথা অনুযায়ী সবাইকে সালাম দেওয়ার আগে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুলা ভাইয়ের দিকে তাকান। বরের দুলাভাই কিসলু মিয়া বেশ রসিক মানুষ। বয়স পঞ্চাশের উর্দ্ধে হলেও একমাত্র শালার বিয়ে তাই সাথে সাথে আছেন। বর মুখ দুলাভাই কিসলু সাহেবের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে পুলিশ ভ্যান আগমনের হেতু জানতে চায়। দুলাভাই পুলিশ ভ্যান এর আগমনের কথা জানার পর বয়োঃবৃদ্ধ শালাকে সাহস দেন। কিসলু সাহেব পলিটিক্স করা লোক, দল ক্ষমতায় তাই ভ্রুক্ষেপ করেন না। উল্টো বললেন, “মেয়ে পক্ষের আত্মীয় স্বজন কেউ হয়তো পুলিশে আছে, তাই উনারা দাওয়াতে এসেছেন।” ভরসার জায়গা থেকে সবুজ বাতি পেয়ে একটু স্বস্তি পান। সবাইকে ইশারায় এবং মুখে সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকার জন্য পা বাড়ান।‌ কিন্তু পুলিশ ভ্যান দেখার পর থেকে যে হালকা হেঁচকি শুরু হয়েছে সেটা যেন এখন বেড়ে চলছে।

হীরকের পুলিশ মামা রিমন সাহেব আগে থেকে সবকিছু ওয়াকিবহাল। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। বর গেটের সামনে আসতেই মেয়ে পক্ষের তরুণ তরুণীরা বেশ খুশি মনে জামাইয়ের কাছ থেকে গেট মানি সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বরের সাথে আসা কিছু ছেলে ধাক্কা ধাক্কি করতে এসে সুবিধা করতে পারে না। এইদিকে বরের হেঁচকির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুলাভাই কিসলু মিয়া একটু বিরক্ত হয়েই বলে,”হচ্ছেটা কী, তোমার হেঁচকিটা একটু বন্ধ রাখবে?”

বরের এমন হেঁচকি দেখে সবাই একটু অবাক হয়। কেউ একজন পানি এগিয়ে দিতে যাবে ঠিক তখনি তন্ময় বাঁধা দেয়। “এই মুহূর্তে আমাদের দুলাভাইয়ের জন্য দরকার শরবত। তিন্নী ঝালবতটা নিয়ে আয় তো।” তিন্নী পাশেই ঝালবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝালবত শব্দটা শোনে কিসলু মিয়ার মনে খটকা লাগে।নিজের ধারাকে অপরিচিত জিনিস খাওয়ানোর আগেই “ঝালবত কী?” জানতে চায়।

“আরে দুলাভাই এর দুলাভাই, আপনি একটু ব্যাকডেটেড, শরবতের আধুনিক আপডেট ভার্সন হচ্ছে ঝালবত। যারা একটু বয়স্ক হয়ে বিয়ে করে তাদের গেটে আপ্যায়ণ করার পানীয়।” তন্ময় বেশ সুন্দর ভাবে চাটুকারদের মতো বুঝিয়ে দেয়। কিসলু মিয়া একটু সন্দেহ প্রবণ লোক। বিষয়টাকে ভাল ভাবে নেয় না, কিন্তু মুখেও নিষেধ করতে পারছে না।

তিন্নী ঝালবতের গ্লাসটা নিয়ে জামাইয়ের নিকট গিয়ে দাঁড়ায়। “নিন দুলাভাই এই ঝালবতটা পান করুন, আপনার হেঁচকি আকাশে উড়ে যাবে”। তিন্নী গ্লাসটা মুখের সামনে নিয়ে ধরে, বর মুখ নিচু করে একটু মুখে দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঝালে দুই ঠোঁট যেন জ্বলে যাচ্ছে কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছে না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।‌

কিসলু সাহেবের একটু সন্দেহ হয়, এইটা শরবত না অন্য কিছু মনের ভেতর খচখচানি জাগে। শেষে ধৈর্য্য ধারণ করতে না পেরে নিজেই গ্লাসটা হাতে নিয়ে শরবত মনে করে চূমুক দেয় কিন্তু মাত্রারিক্ত ঝালের কারণে আর গিলতে পারেন না। শেষে পেছন ফিরে পচাত করে মুখ থেকে বের করে ফেলে দেন। ঝালে তাঁর পুরো মুখ যেন জ্বলে যাচ্ছে। কিসলু সাহেবেরও হেঁচকি শুরু হয়ে যায়।‌ ছেলে পক্ষের এক চতুর ছেলে দুটা ললিপপ আইসক্রিম এনে দুই জনের মুখে ধরিয়ে দেয়। এই প্রথম বিয়ে করতে এসে বর পক্ষের লোকজনের মুখে রুমালের পরিবর্তে আইসক্রিম দেখা যায়।‌

গেট মানির আলাপ আলোচনা শেষে বিশ হাজার টাকায় ফয়সালা হয়। তন্ময় হাতে গ্লাভস পড়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিতে রেডি। কিন্তু হঠাৎ কিসলু মিয়ার চোখ পড়ে। সে লোভীর সামনে এসে দাঁড়ায়। “কোন পুষ্প বৃষ্টির প্রয়োজন নেই, আপনারা সরে দাঁড়ান আমরা ভেতরে ঢুকি।” কিসলু মিয়া যেন আবহাওয়া অধিদপ্তর এর কর্মচারী, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলে দিতে পারেন। তন্ময় কথার ফাঁকে দুই বার ঝটপট বরের শরীরে “বিলাইওলা” মিশ্রিত পুষ্প ছুঁড়ে মারে। ছোড়ার সময় কিছু অংশ কিসলু মিয়ার শরীরেও পড়ে।

ফুলের পাপড়ি ছোড়ার সময় সবাই কেমন জানি একটু দূরে দুরে সরে পরে। বর আর তাঁর দুলাভাই কিসলু সাহেব সরতে না পেরে পুষ্প বৃষ্টিতে স্নান করে। দুই জনেই এখন ডিস্কো ড্যান্সের মতো হাত পা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ছুঁয়ে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

বর ও বরের দুলাভাই এর এমন ডিস্কো ড্যান্স টাইপের আচরণের জন্য গেটে একটা ক্যাওয়াস শুরু হয়ে যায়।বর পক্ষের লোকজন হৈচৈ শুরু করে। কিছু এদিক ওদিক সরে দাঁড়ায়। হিরণ্ময় সবাইকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়।‌ ছেলে পক্ষের মুরুব্বি টাইপের একজন এসে বেশ চড়াও হয়ে উচ্চ বাক্য করে। অন্যান্য ছেলে মেয়েরা ভয়ে চুপ হয়ে যায়।

উপস্থিত হিরকের পুলিশ মামা রিমন সাহেব এতক্ষণ মজা দেখছিলেন। গন্ডোগল শুরুর সুযোগ নিয়ে সামনে আসেন। “বর বাবু শ্যারোয়ানীটা বেশ গর্জিয়াস হয়েছে, এইটা কি বিদেশ থেকে কেনা, না যৌতুক এর বিশ লাখ টাকা পেয়ে কিনেছেন?” পুলিশের এমন প্রশ্নে বর ও কিসলু মিয়ার হেঁচকি থেমে যায়। দুজনেই হঠাৎ বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এরমধ্যে আরও চার পাঁচ জন পুলিশ সদস্য তাদের চারপাশ ঘিরে ফেলে। কিসলু সাহেব কিছুই বুঝতে পারেন না।

“আপনারা ভেতরে যাবেন তবে এই কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে না, চৌদ্দ শিকের ভেতরে।” পুলিশ অফিসার যৌতুক নেয়ার অভিযোগে গ্রেফতারী পরোয়ানার কাগজ বরের সামনে ধরেন। বর কাগজে লেখা গ্রেফতারী পরোয়ানা পড়েই হতভম্ব হয়ে যায়। যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তার অভিযোগের ভিত্তিতেই এই গ্রেফতারী পরোয়ানা। আর কিছু বলতে পারলেন না।

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে থেকে একজন এসে হাতকড়া পড়িয়ে পুলিশ ভ্যানের দিকে চলে যান। ভেতরে এই খবর পৌঁছা মাত্র একটা শোরগোল বেঁধে যায়। হিরণ্ময়ীর বাবা হিকমত সাহেব গেটের দিকে ছুটেন। (চলবে)

 

লেখক পরিচিতিঃ- 

লেখক ডি. এম. কামরুজ্জামান স্বাধীন।

পিতা আব্দুল করিম দেওয়ান তাঁর জীবনে চলার পথের আদর্শ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল‌ প্রবল আগ্রহ। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার ছায়া‌সুনিবির নিভৃত পল্লী কেয়াইন গ্রামে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে বাল্য জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে মাদ্রাসা শিক্ষায়। সেখানে মন বসাতে না পেরে অতঃপর আবার প্রাইমারী স্কুলে ফেরত। দূরন্ত কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতে।‌

স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় “বাংলাদেশ শিশু একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “শিশু পত্রিকায়” বর্ষা‌ সংখ্যায় প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়।

শিক্ষা-জীবনঃ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কুচিয়ামোড়া থেকে এস.এস.সি, তেজগাঁও কলেজ ঢাকা থেকে এইচ.এস. সি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন।

পেশাঃ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সেলস্ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন।

পছন্দঃ খেলাধুলা, বই পড়া, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ও সাহিত্য চর্চা করা।

রচনাবলীঃ দেশের স্বনামধন্য অনেক শিল্পী লেখকের রচিত গানের কথায় গান গেয়েছেন। ইউটিউবসহ অনেক অনলাইন প্ল্যাপফর্মে লেখকের লেখা গান এর ভিডিও অডিও দেখা ও শোনা যায়। লেখকের অসংখ্য কবিতা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নাটকের স্ক্রিপ্ট, গানের ভিডিও স্ক্রিপ্ট, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া ও গান রচনা করেন।

পুরস্কারঃ বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য সংগঠন ও সাহিত্য পত্রিকা থেকে অসংখ্য সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন।

শেয়ার করুন :

আপলোডকারীর তথ্য

ধারাবাহিক গল্প।

গল্পঃ- ‘কন্যার বিবাহ’ – ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন। পর্ব – ৪ || দৈনিক নয়ালোক

আপডেট সময় : ১০:৩৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০২৩

“কন্যার বিবাহ”

রচনাঃ- ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন।

“চতুর্থ খন্ড”

হিকমত সাহেব মেয়ের বিয়েতে কোনো কিছুর ঘাটতি রাখতে নারাজ। ছেলে হিরণ্ময়কে বাড়ি সাজসজ্জার দায়িত্ব দিয়েছেন। হিরণ্ময় তার দায়িত্বের বিন্দুমাত্র অবহেলা করছে না। বন্ধু বান্ধব ও কাজিনরা মিলে সর্বক্ষণ এজেন্সির কাজ নিখুঁত ভাবে হচ্ছে কিনা তদারকি করছে।

সাত তলা ভবনের পুরো ভবন ও মহল্লার মেইন রোডের মোড় থেকে বাড়ির গেট পর্যন্ত মরিচ বাতির রংবেরং এর আলো দিয়ে সাজিয়েছে। ফুল, গাছের ডালপালা আর কৃত্রিম আলোয় দারুণ চাকচিক্যময় গেট তৈরি করা হয়েছে। হিরণ্ময়ী যে গাড়ি চরে বিউটি পার্লার হয়ে কমিউনিটি সেন্টারে আসবে সেই গাড়িও তাজা ফুলে সাজানো হয়েছে।

শহরের নামকরা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকেই আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে পাত্রী পক্ষের লোকজনের সংখ্যাই বেশি। তন্ময়, তিন্নীসহ সব বন্ধু বান্ধবীরা যথা সময়ে হাজির। হীরক তার মা বাবাসহ এসেছে। হিরণ্ময়ীর কথা মত পায়জামা পাঞ্জাবি পড়েছে, দেখতে বরের মতোই লাগছে। মাথায় পাগড়ি পড়িয়ে দিলে যে কেউ জামাই ভেবে ভুল করবে নিশ্চিত।

কমিউনিটি সেন্টারের গেট থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে বলে ,”বরের গাড়ি এসেছে….” তরুণ তরুণীদের মধ্যে একটা আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। সবাই দৌড়ে গেটের সামনে চলে আসে। হিরণ্ময় বন্ধু বান্ধবী আর কাজিনদের নিয়ে গেটের সামনে দাঁড়ায়। তন্ময়, তিন্নী ও হীরকসহ হিরণ্ময়ীর বন্ধুরা পেছনের সারিতে দাঁড়ায়। দুইজন দুই পাশে একটা লালা ফিতা ধরে গেট আঁটকে রাখে। একজন একটা ট্রেতে মিষ্টি আর সিজার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

হিরণ্ময়ীর বাবা এগিয়ে গিয়ে আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণি বরকে গাড়ি থেকে নামান। বর লোভাতুর রহমান লোভী গাড়ি থেকে নেমে চারিদিকে একবার তাকান, সামনে একটি পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভরকে যান। “চোরের মন পুলিশ পুলিশ” বলে একটা প্রবাদ আছে ঠিক এই মুহূর্তে সেই রকম কিছুই যেন বর লোভীর মনে খেলা করে। যৌতুক নেয়া মে রাষ্ট্রীয় আইন বিরোধী সেটা মাথায় আসে।

বর প্রথা অনুযায়ী সবাইকে সালাম দেওয়ার আগে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুলা ভাইয়ের দিকে তাকান। বরের দুলাভাই কিসলু মিয়া বেশ রসিক মানুষ। বয়স পঞ্চাশের উর্দ্ধে হলেও একমাত্র শালার বিয়ে তাই সাথে সাথে আছেন। বর মুখ দুলাভাই কিসলু সাহেবের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে পুলিশ ভ্যান আগমনের হেতু জানতে চায়। দুলাভাই পুলিশ ভ্যান এর আগমনের কথা জানার পর বয়োঃবৃদ্ধ শালাকে সাহস দেন। কিসলু সাহেব পলিটিক্স করা লোক, দল ক্ষমতায় তাই ভ্রুক্ষেপ করেন না। উল্টো বললেন, “মেয়ে পক্ষের আত্মীয় স্বজন কেউ হয়তো পুলিশে আছে, তাই উনারা দাওয়াতে এসেছেন।” ভরসার জায়গা থেকে সবুজ বাতি পেয়ে একটু স্বস্তি পান। সবাইকে ইশারায় এবং মুখে সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকার জন্য পা বাড়ান।‌ কিন্তু পুলিশ ভ্যান দেখার পর থেকে যে হালকা হেঁচকি শুরু হয়েছে সেটা যেন এখন বেড়ে চলছে।

হীরকের পুলিশ মামা রিমন সাহেব আগে থেকে সবকিছু ওয়াকিবহাল। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গেটের পাশেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। বর গেটের সামনে আসতেই মেয়ে পক্ষের তরুণ তরুণীরা বেশ খুশি মনে জামাইয়ের কাছ থেকে গেট মানি সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বরের সাথে আসা কিছু ছেলে ধাক্কা ধাক্কি করতে এসে সুবিধা করতে পারে না। এইদিকে বরের হেঁচকির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুলাভাই কিসলু মিয়া একটু বিরক্ত হয়েই বলে,”হচ্ছেটা কী, তোমার হেঁচকিটা একটু বন্ধ রাখবে?”

বরের এমন হেঁচকি দেখে সবাই একটু অবাক হয়। কেউ একজন পানি এগিয়ে দিতে যাবে ঠিক তখনি তন্ময় বাঁধা দেয়। “এই মুহূর্তে আমাদের দুলাভাইয়ের জন্য দরকার শরবত। তিন্নী ঝালবতটা নিয়ে আয় তো।” তিন্নী পাশেই ঝালবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝালবত শব্দটা শোনে কিসলু মিয়ার মনে খটকা লাগে।নিজের ধারাকে অপরিচিত জিনিস খাওয়ানোর আগেই “ঝালবত কী?” জানতে চায়।

“আরে দুলাভাই এর দুলাভাই, আপনি একটু ব্যাকডেটেড, শরবতের আধুনিক আপডেট ভার্সন হচ্ছে ঝালবত। যারা একটু বয়স্ক হয়ে বিয়ে করে তাদের গেটে আপ্যায়ণ করার পানীয়।” তন্ময় বেশ সুন্দর ভাবে চাটুকারদের মতো বুঝিয়ে দেয়। কিসলু মিয়া একটু সন্দেহ প্রবণ লোক। বিষয়টাকে ভাল ভাবে নেয় না, কিন্তু মুখেও নিষেধ করতে পারছে না।

তিন্নী ঝালবতের গ্লাসটা নিয়ে জামাইয়ের নিকট গিয়ে দাঁড়ায়। “নিন দুলাভাই এই ঝালবতটা পান করুন, আপনার হেঁচকি আকাশে উড়ে যাবে”। তিন্নী গ্লাসটা মুখের সামনে নিয়ে ধরে, বর মুখ নিচু করে একটু মুখে দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেয়, ঝালে দুই ঠোঁট যেন জ্বলে যাচ্ছে কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছে না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।‌

কিসলু সাহেবের একটু সন্দেহ হয়, এইটা শরবত না অন্য কিছু মনের ভেতর খচখচানি জাগে। শেষে ধৈর্য্য ধারণ করতে না পেরে নিজেই গ্লাসটা হাতে নিয়ে শরবত মনে করে চূমুক দেয় কিন্তু মাত্রারিক্ত ঝালের কারণে আর গিলতে পারেন না। শেষে পেছন ফিরে পচাত করে মুখ থেকে বের করে ফেলে দেন। ঝালে তাঁর পুরো মুখ যেন জ্বলে যাচ্ছে। কিসলু সাহেবেরও হেঁচকি শুরু হয়ে যায়।‌ ছেলে পক্ষের এক চতুর ছেলে দুটা ললিপপ আইসক্রিম এনে দুই জনের মুখে ধরিয়ে দেয়। এই প্রথম বিয়ে করতে এসে বর পক্ষের লোকজনের মুখে রুমালের পরিবর্তে আইসক্রিম দেখা যায়।‌

গেট মানির আলাপ আলোচনা শেষে বিশ হাজার টাকায় ফয়সালা হয়। তন্ময় হাতে গ্লাভস পড়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দিতে রেডি। কিন্তু হঠাৎ কিসলু মিয়ার চোখ পড়ে। সে লোভীর সামনে এসে দাঁড়ায়। “কোন পুষ্প বৃষ্টির প্রয়োজন নেই, আপনারা সরে দাঁড়ান আমরা ভেতরে ঢুকি।” কিসলু মিয়া যেন আবহাওয়া অধিদপ্তর এর কর্মচারী, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলে দিতে পারেন। তন্ময় কথার ফাঁকে দুই বার ঝটপট বরের শরীরে “বিলাইওলা” মিশ্রিত পুষ্প ছুঁড়ে মারে। ছোড়ার সময় কিছু অংশ কিসলু মিয়ার শরীরেও পড়ে।

ফুলের পাপড়ি ছোড়ার সময় সবাই কেমন জানি একটু দূরে দুরে সরে পরে। বর আর তাঁর দুলাভাই কিসলু সাহেব সরতে না পেরে পুষ্প বৃষ্টিতে স্নান করে। দুই জনেই এখন ডিস্কো ড্যান্সের মতো হাত পা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ছুঁয়ে একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

বর ও বরের দুলাভাই এর এমন ডিস্কো ড্যান্স টাইপের আচরণের জন্য গেটে একটা ক্যাওয়াস শুরু হয়ে যায়।বর পক্ষের লোকজন হৈচৈ শুরু করে। কিছু এদিক ওদিক সরে দাঁড়ায়। হিরণ্ময় সবাইকে নিয়ে ভেতরে চলে যায়।‌ ছেলে পক্ষের মুরুব্বি টাইপের একজন এসে বেশ চড়াও হয়ে উচ্চ বাক্য করে। অন্যান্য ছেলে মেয়েরা ভয়ে চুপ হয়ে যায়।

উপস্থিত হিরকের পুলিশ মামা রিমন সাহেব এতক্ষণ মজা দেখছিলেন। গন্ডোগল শুরুর সুযোগ নিয়ে সামনে আসেন। “বর বাবু শ্যারোয়ানীটা বেশ গর্জিয়াস হয়েছে, এইটা কি বিদেশ থেকে কেনা, না যৌতুক এর বিশ লাখ টাকা পেয়ে কিনেছেন?” পুলিশের এমন প্রশ্নে বর ও কিসলু মিয়ার হেঁচকি থেমে যায়। দুজনেই হঠাৎ বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এরমধ্যে আরও চার পাঁচ জন পুলিশ সদস্য তাদের চারপাশ ঘিরে ফেলে। কিসলু সাহেব কিছুই বুঝতে পারেন না।

“আপনারা ভেতরে যাবেন তবে এই কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে না, চৌদ্দ শিকের ভেতরে।” পুলিশ অফিসার যৌতুক নেয়ার অভিযোগে গ্রেফতারী পরোয়ানার কাগজ বরের সামনে ধরেন। বর কাগজে লেখা গ্রেফতারী পরোয়ানা পড়েই হতভম্ব হয়ে যায়। যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তার অভিযোগের ভিত্তিতেই এই গ্রেফতারী পরোয়ানা। আর কিছু বলতে পারলেন না।

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে থেকে একজন এসে হাতকড়া পড়িয়ে পুলিশ ভ্যানের দিকে চলে যান। ভেতরে এই খবর পৌঁছা মাত্র একটা শোরগোল বেঁধে যায়। হিরণ্ময়ীর বাবা হিকমত সাহেব গেটের দিকে ছুটেন। (চলবে)

 

লেখক পরিচিতিঃ- 

লেখক ডি. এম. কামরুজ্জামান স্বাধীন।

পিতা আব্দুল করিম দেওয়ান তাঁর জীবনে চলার পথের আদর্শ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল‌ প্রবল আগ্রহ। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার ছায়া‌সুনিবির নিভৃত পল্লী কেয়াইন গ্রামে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে বাল্য জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে মাদ্রাসা শিক্ষায়। সেখানে মন বসাতে না পেরে অতঃপর আবার প্রাইমারী স্কুলে ফেরত। দূরন্ত কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতে।‌

স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় “বাংলাদেশ শিশু একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “শিশু পত্রিকায়” বর্ষা‌ সংখ্যায় প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়।

শিক্ষা-জীবনঃ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কুচিয়ামোড়া থেকে এস.এস.সি, তেজগাঁও কলেজ ঢাকা থেকে এইচ.এস. সি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন।

পেশাঃ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সেলস্ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন।

পছন্দঃ খেলাধুলা, বই পড়া, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ও সাহিত্য চর্চা করা।

রচনাবলীঃ দেশের স্বনামধন্য অনেক শিল্পী লেখকের রচিত গানের কথায় গান গেয়েছেন। ইউটিউবসহ অনেক অনলাইন প্ল্যাপফর্মে লেখকের লেখা গান এর ভিডিও অডিও দেখা ও শোনা যায়। লেখকের অসংখ্য কবিতা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নাটকের স্ক্রিপ্ট, গানের ভিডিও স্ক্রিপ্ট, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া ও গান রচনা করেন।

পুরস্কারঃ বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য সংগঠন ও সাহিত্য পত্রিকা থেকে অসংখ্য সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন।