ঢাকা ১০:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গল্পঃ- ‘কন্যার বিবাহ’ – ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন। পর্ব – ২ || দৈনিক নয়ালোক

SRI Bonsai
  • আপডেট সময় : ০১:৫১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ মে ২০২৩
  • / ৫১৪৩ বার পড়া হয়েছে

‘কন্যার বিবাহ’

কলমেঃ- ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন

“দ্বিতীয় খন্ড”

হিকমত সাহেবের স্ত্রী হনুফা বানু বিয়ের কার্ড নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন, হিকমত সাহেব পাশেই ঘাপটি মেরে শুয়ে আছেন। তাঁর বুকের বাম পাশের ব্যথাটা কমলেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। “এই যে শুনছেন, শুয়ে থাকলে হবে, বিয়ের কার্ড বিলি করতে হবে না?” বাম হাত দিয়ে হিকমত সাহেবের শরীরে হালকা ধাক্কা দিয়ে হনুফা বানু তাগাদা দেন। স্ত্রীর হালকা ধাক্কায় হিকমত সাহেব তেমন তোয়াক্কা করলেন না, আগের মতোই নির্বাক হয়ে শুয়ে রইলেন। হিকমত সাহেবের মাথায় একটাই চিন্তা টাকা ম্যানেজ করা। এই মুহুর্তে শুয়ে শুয়ে ভাবছেন, গ্রামে যাবেন, উত্তোরাধিকার সূত্র বাবা-দাদার কাছ থেকে যা পেয়েছেন, সেখান থেকে কিছু অংশ বিক্রি করে টাকা ম্যানেজ করবেন। স্বামীর দিক থেকে সারা শব্দ না পেয়ে হনুফা বানু কার্ড গুলো গুছিয়ে পাশ টেবিলে রেখে দিলেন এবং নিজেও শুয়ে পড়লেন।

হিরণ্ময়ী বেশ চিন্তিত। বাবা মায়ের পছন্দের ছেলের সাথে বিয়েটা কিভাবে পন্ড করা যায় সেই ফন্দী খোঁজায় মগ্ন। মাথার মধ্যে একটা দুষ্টু বুদ্ধি কয়দিন ধরেই খেলা করছে। একুশ শতকে এসেও যে ছেলে বিয়েতে যৌতুক চায়, তাঁর একটা শিক্ষা হওয়া উচিত। কীভাবে শিক্ষা দিবে সেই উপায় খোঁজাতেই ব্যতিব্যস্ত। হাতের কাছে থাকা সেলফোনটা তুলে নেয়। একমাত্র ভরসা প্রেমিক হীরক, ওকেই ডায়াল করে। একবার রিং হতেই হীরক রিসিভ করে। “তুমি কি সত্যিই ঐ বিদেশ ফেরত কাউল্লাটার গলায় মালা পড়াবে?” কোনো প্রকার কুশল বিনিময় ব্যতিরেকেই হীরক সরাসরি অভিযোগের তীর ছুঁড়ে দেয়। হিরণ্ময়ী অভিযোগ কানে না নিয়ে হীরকের অস্থিরতা দেখে খিলখিল করে হেসে যায়। “তুমি হাসছো!! হাসবেই তো, বিয়ে করে বরের সাথে উড়াল দিবে, হাসবে না?” এবার অভিযোগের সাথে অভিমান যোগ হয়। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা হিরণ্ময়ীর হাসি কিন্তু থামছে না। অন্য সময় হিরণ্ময়ীর হাসি ভাল লাগলেও এখন হীরকের কাছে কেমন জানি ভিলেনের অট্টহাসির মতো উদ্ভট লাগছে।

“তুমি কি হাসি থামাবে, না আমি ফোন রেখে দিব?” এইবার হীরকের রাগও যোগ হয়। হিরণ্ময়ী বুঝতে পারে হীরক ক্ষেপে যাচ্ছে। “ওরে হাবলু, হৃদয় যারে দিয়েছি বিয়ে তাঁকেই করবো, এর জন্য হাবলু তোমার সাহায্য লাগবে।“। এইবারও হিরণ্ময়ী হাসে, অন্য সময় হাবলু বললে হীরক রেগে যায় কিন্তু এখন কিছুই বলছে না, এই ব্যপারটাও হাসির খোরাক যোগাচ্ছে।

“কি রকম সাহায্য লাগবে?” হীরক একটু আশাবাদী হয়ে উৎসুক জনতার মত জানতে চায়। হিরণ্ময়ী এবার একটু শান্ত হয়, কিভাবে বলবে ভাবে। “কি হলো? কিছু বলছো না যে…” । হিরণ্ময়ীর নীরবতা দেখে হীরক আবার তাড়া দেয়।

“আরে বাবা, একটু ভাবতে তো দিবে” । এতক্ষণ হিরণ্ময়ী রুমের দরজা খোলা রেখে কথা বলছিল, মাথায় আসা বুদ্ধিটা শেয়ার করার আগে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে এরপর ফিস ফিস করে বলে, “আংকেল আন্টিতো চায় আমি তোমার বউ হই, তাই না?” কথাটা বলে একটু থামে, হীরক চুপচাপ শুনছে।

“শোন, তুমি বিয়ের দিন বর এর মতো করে সেঁজে আসবে আর আংকেল আন্টিকে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলবে” হিরণ্ময়ী থামে।

“কেন?” হীরক বোকার মত ঝটপট পাল্টা প্রশ্ন করে বসে, এমন বোকার মত প্রশ্নে অন্য সময় হিরণ্ময়ী রাগ করলেও এখন তা করছে না, পরিকল্পনাটা বোঝানোর জন্য রাগ না করে মন স্থির করে।

“শোনো কাল দুজনে একটু পুলিশের কাছে যাবো, তোমার পুলিশ মামার সাহায্য লাগবে” । হিরণ্ময়ী কথা শেষ করে দরজার দিকে তাকায়, কেউ এদিকে আসছে কিনা চেক করে নেয়।

“পুলিশ দিয়ে কী বিয়ে আটকাবে? মামা এইসব পারবে না, উল্টো আমকেই বিয়ে ভাঙ্গার অভিযোগে থানায় ভরে দিবে” । হীরক বিষয়টা না বোঝেই মন্তব্য করে, আসলে অনেক সময় বুদ্ধিমান মানুষ প্রিয় কিছু হারানোর ভয়ে বুদ্ধিহীন হয়ে যায়, এখন যেমনটা হয়েছে হীরকের ।

“এর জন্যই তোমাকে হাবলু বলি, কথা না বোঝেই একটা মন্তব্য করে বসো” । হিরণ্ময়ী একটু বিরক্ত হয়, কিন্তু ধৈর্য্যহারা হয় না।

“ঐ বিদেশ ফেরত কাউল্লা যে বাবার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা যৌতুক নিয়েছেন, সেই চেকের একটা ছবি এবং পাতার অংশ আমার কাছে আছে, আমি পুলিশের কাছে গিয়ে দেখাবো এবং জোড় করে যৌতুক নেয়ার অভিযোগে থানায় জিডি করবো। তোমার মামাকে বিয়ের দিন থাকতে হবে এবং বর যখন গেটের সামনে আসবে তখন পুলিশ উপস্থিত হবে, কিছু বুঝলে?” আকস্মিক দরজাইয় শব্দ হয়। হিরণ্ময়ী ফোন কেটে দেয় এবং দরজা খোলে দেখে ছোট ভাই হিরণ্ময় দাঁড়িয়ে আছে। “মা খেতে ডাকছে” হিরণ্ময় আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে যায়।

সকালে নাস্তার টেবিলে হনুফা বানু আর হিরণ্ময়ী মুখোমুখি বসা। দুজনের হাতেই চায়ের কাপ, দুজনেই চুপচাপ চায়ের কাপে ঠৌট ছোঁয়ায়। বেশ গরম বিধায় কেউ মুখে নিতে পারে না। দুজনেই কাপ টেবিলের উপর রাখে। কেউ কাউকে কিছু বলছে না। বিয়ে পাকাপাকি হবার পর থেকেই চঞ্চলা মেয়েটি নীরব হয়ে গেছে। হনুফা বানু মেয়ের এই অবস্থার সাথে নিজের বিয়ের আগ মুহূর্তের কথা মিলানোর চেষ্টা করে, একটু নষ্টালজিক হয়।‌

হনুফা বানু সতের বছর বয়সে বিয়ের কথা শোনে ভয়ে নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিলেন। বিয়ের জন্য প্রস্তুত নন এই কথাটা বলারও সাহস পাননি। এখনকার মেয়েরা কতো এডভান্স। নিজের বিয়ের অনুষ্ঠান নিজের মত করে করতে চায়, নিজেই বন্ধু বান্ধব নিয়ে বাজেট করে। হনুফা বানু নিজেই মনে মনে একটু হাসে।

“কি রে তুই বলে গায়ে হলুদ, ফটোগ্রাফী, ভিডিও গ্রাফী আরও কী সব বলে…. তার জন্য তোর বাবার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছিস”? হনুফা বানু মেয়ের নীরবতা দেখে নিজেই প্রসঙ্গ টা তুলেন।‌

“মা মাত্র পাঁচ লাখ চেয়েছি, বেশী তো চাইনি। ধরো আমি যদি বিয়ে না করে তোমাদের সাথে আরও পাঁচ বছর কাটিয়ে দেই তাহলে কী পাঁচ বছরে আমার জন্য তোমাদের পাঁচ লাখ টাকা খরচ হবে না!! ” হাতের কাপটা টেবিলে রেখে আঙ্গুল গুনে গুনে বলে।

“তোর বাবা টাকার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, চেহারার দিকে তাকানো যায় না, আর তুই বলছিস মাত্র পাঁচ লাখ!!”, হনুফা বানুর যেন বিস্ময় কাটে না। মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। হিরণময়ী নির্বিঘ্নে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।….(চলবে)

 

লেখক পরিচিতিঃ-

লেখক ডি. এম. কামরুজ্জামান স্বাধীন।

পিতা আব্দুল করিম দেওয়ান তাঁর জীবনে চলার পথের আদর্শ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল‌ প্রবল আগ্রহ। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার ছায়া‌সুনিবির নিভৃত পল্লী কেয়াইন গ্রামে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে বাল্য জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে মাদ্রাসা শিক্ষায়। সেখানে মন বসাতে না পেরে অতঃপর আবার প্রাইমারী স্কুলে ফেরত। দূরন্ত কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতে।‌

স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় “বাংলাদেশ শিশু একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “শিশু পত্রিকায়” বর্ষা‌ সংখ্যায় প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়।

শিক্ষা-জীবনঃ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কুচিয়ামোড়া থেকে এস.এস.সি, তেজগাঁও কলেজ ঢাকা থেকে এইচ.এস. সি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন।

পেশাঃ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সেলস্ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন।

পছন্দঃ খেলাধুলা, বই পড়া, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ও সাহিত্য চর্চা করা।

রচনাবলীঃ দেশের স্বনামধন্য অনেক শিল্পী লেখকের রচিত গানের কথায় গান গেয়েছেন। ইউটিউবসহ অনেক অনলাইন প্ল্যাপফর্মে লেখকের লেখা গান এর ভিডিও অডিও দেখা ও শোনা যায়। লেখকের অসংখ্য কবিতা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নাটকের স্ক্রিপ্ট, গানের ভিডিও স্ক্রিপ্ট, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া ও গান রচনা করেন।

পুরস্কারঃ বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য সংগঠন ও সাহিত্য পত্রিকা থেকে অসংখ্য সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন।

শেয়ার করুন :

আপলোডকারীর তথ্য

গল্পঃ- ‘কন্যার বিবাহ’ – ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন। পর্ব – ২ || দৈনিক নয়ালোক

আপডেট সময় : ০১:৫১:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ মে ২০২৩

‘কন্যার বিবাহ’

কলমেঃ- ডি এম কামরুজ্জামান স্বাধীন

“দ্বিতীয় খন্ড”

হিকমত সাহেবের স্ত্রী হনুফা বানু বিয়ের কার্ড নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন, হিকমত সাহেব পাশেই ঘাপটি মেরে শুয়ে আছেন। তাঁর বুকের বাম পাশের ব্যথাটা কমলেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। “এই যে শুনছেন, শুয়ে থাকলে হবে, বিয়ের কার্ড বিলি করতে হবে না?” বাম হাত দিয়ে হিকমত সাহেবের শরীরে হালকা ধাক্কা দিয়ে হনুফা বানু তাগাদা দেন। স্ত্রীর হালকা ধাক্কায় হিকমত সাহেব তেমন তোয়াক্কা করলেন না, আগের মতোই নির্বাক হয়ে শুয়ে রইলেন। হিকমত সাহেবের মাথায় একটাই চিন্তা টাকা ম্যানেজ করা। এই মুহুর্তে শুয়ে শুয়ে ভাবছেন, গ্রামে যাবেন, উত্তোরাধিকার সূত্র বাবা-দাদার কাছ থেকে যা পেয়েছেন, সেখান থেকে কিছু অংশ বিক্রি করে টাকা ম্যানেজ করবেন। স্বামীর দিক থেকে সারা শব্দ না পেয়ে হনুফা বানু কার্ড গুলো গুছিয়ে পাশ টেবিলে রেখে দিলেন এবং নিজেও শুয়ে পড়লেন।

হিরণ্ময়ী বেশ চিন্তিত। বাবা মায়ের পছন্দের ছেলের সাথে বিয়েটা কিভাবে পন্ড করা যায় সেই ফন্দী খোঁজায় মগ্ন। মাথার মধ্যে একটা দুষ্টু বুদ্ধি কয়দিন ধরেই খেলা করছে। একুশ শতকে এসেও যে ছেলে বিয়েতে যৌতুক চায়, তাঁর একটা শিক্ষা হওয়া উচিত। কীভাবে শিক্ষা দিবে সেই উপায় খোঁজাতেই ব্যতিব্যস্ত। হাতের কাছে থাকা সেলফোনটা তুলে নেয়। একমাত্র ভরসা প্রেমিক হীরক, ওকেই ডায়াল করে। একবার রিং হতেই হীরক রিসিভ করে। “তুমি কি সত্যিই ঐ বিদেশ ফেরত কাউল্লাটার গলায় মালা পড়াবে?” কোনো প্রকার কুশল বিনিময় ব্যতিরেকেই হীরক সরাসরি অভিযোগের তীর ছুঁড়ে দেয়। হিরণ্ময়ী অভিযোগ কানে না নিয়ে হীরকের অস্থিরতা দেখে খিলখিল করে হেসে যায়। “তুমি হাসছো!! হাসবেই তো, বিয়ে করে বরের সাথে উড়াল দিবে, হাসবে না?” এবার অভিযোগের সাথে অভিমান যোগ হয়। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা হিরণ্ময়ীর হাসি কিন্তু থামছে না। অন্য সময় হিরণ্ময়ীর হাসি ভাল লাগলেও এখন হীরকের কাছে কেমন জানি ভিলেনের অট্টহাসির মতো উদ্ভট লাগছে।

“তুমি কি হাসি থামাবে, না আমি ফোন রেখে দিব?” এইবার হীরকের রাগও যোগ হয়। হিরণ্ময়ী বুঝতে পারে হীরক ক্ষেপে যাচ্ছে। “ওরে হাবলু, হৃদয় যারে দিয়েছি বিয়ে তাঁকেই করবো, এর জন্য হাবলু তোমার সাহায্য লাগবে।“। এইবারও হিরণ্ময়ী হাসে, অন্য সময় হাবলু বললে হীরক রেগে যায় কিন্তু এখন কিছুই বলছে না, এই ব্যপারটাও হাসির খোরাক যোগাচ্ছে।

“কি রকম সাহায্য লাগবে?” হীরক একটু আশাবাদী হয়ে উৎসুক জনতার মত জানতে চায়। হিরণ্ময়ী এবার একটু শান্ত হয়, কিভাবে বলবে ভাবে। “কি হলো? কিছু বলছো না যে…” । হিরণ্ময়ীর নীরবতা দেখে হীরক আবার তাড়া দেয়।

“আরে বাবা, একটু ভাবতে তো দিবে” । এতক্ষণ হিরণ্ময়ী রুমের দরজা খোলা রেখে কথা বলছিল, মাথায় আসা বুদ্ধিটা শেয়ার করার আগে উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে এরপর ফিস ফিস করে বলে, “আংকেল আন্টিতো চায় আমি তোমার বউ হই, তাই না?” কথাটা বলে একটু থামে, হীরক চুপচাপ শুনছে।

“শোন, তুমি বিয়ের দিন বর এর মতো করে সেঁজে আসবে আর আংকেল আন্টিকে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে বলবে” হিরণ্ময়ী থামে।

“কেন?” হীরক বোকার মত ঝটপট পাল্টা প্রশ্ন করে বসে, এমন বোকার মত প্রশ্নে অন্য সময় হিরণ্ময়ী রাগ করলেও এখন তা করছে না, পরিকল্পনাটা বোঝানোর জন্য রাগ না করে মন স্থির করে।

“শোনো কাল দুজনে একটু পুলিশের কাছে যাবো, তোমার পুলিশ মামার সাহায্য লাগবে” । হিরণ্ময়ী কথা শেষ করে দরজার দিকে তাকায়, কেউ এদিকে আসছে কিনা চেক করে নেয়।

“পুলিশ দিয়ে কী বিয়ে আটকাবে? মামা এইসব পারবে না, উল্টো আমকেই বিয়ে ভাঙ্গার অভিযোগে থানায় ভরে দিবে” । হীরক বিষয়টা না বোঝেই মন্তব্য করে, আসলে অনেক সময় বুদ্ধিমান মানুষ প্রিয় কিছু হারানোর ভয়ে বুদ্ধিহীন হয়ে যায়, এখন যেমনটা হয়েছে হীরকের ।

“এর জন্যই তোমাকে হাবলু বলি, কথা না বোঝেই একটা মন্তব্য করে বসো” । হিরণ্ময়ী একটু বিরক্ত হয়, কিন্তু ধৈর্য্যহারা হয় না।

“ঐ বিদেশ ফেরত কাউল্লা যে বাবার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা যৌতুক নিয়েছেন, সেই চেকের একটা ছবি এবং পাতার অংশ আমার কাছে আছে, আমি পুলিশের কাছে গিয়ে দেখাবো এবং জোড় করে যৌতুক নেয়ার অভিযোগে থানায় জিডি করবো। তোমার মামাকে বিয়ের দিন থাকতে হবে এবং বর যখন গেটের সামনে আসবে তখন পুলিশ উপস্থিত হবে, কিছু বুঝলে?” আকস্মিক দরজাইয় শব্দ হয়। হিরণ্ময়ী ফোন কেটে দেয় এবং দরজা খোলে দেখে ছোট ভাই হিরণ্ময় দাঁড়িয়ে আছে। “মা খেতে ডাকছে” হিরণ্ময় আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে যায়।

সকালে নাস্তার টেবিলে হনুফা বানু আর হিরণ্ময়ী মুখোমুখি বসা। দুজনের হাতেই চায়ের কাপ, দুজনেই চুপচাপ চায়ের কাপে ঠৌট ছোঁয়ায়। বেশ গরম বিধায় কেউ মুখে নিতে পারে না। দুজনেই কাপ টেবিলের উপর রাখে। কেউ কাউকে কিছু বলছে না। বিয়ে পাকাপাকি হবার পর থেকেই চঞ্চলা মেয়েটি নীরব হয়ে গেছে। হনুফা বানু মেয়ের এই অবস্থার সাথে নিজের বিয়ের আগ মুহূর্তের কথা মিলানোর চেষ্টা করে, একটু নষ্টালজিক হয়।‌

হনুফা বানু সতের বছর বয়সে বিয়ের কথা শোনে ভয়ে নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে কেঁদেছিলেন। বিয়ের জন্য প্রস্তুত নন এই কথাটা বলারও সাহস পাননি। এখনকার মেয়েরা কতো এডভান্স। নিজের বিয়ের অনুষ্ঠান নিজের মত করে করতে চায়, নিজেই বন্ধু বান্ধব নিয়ে বাজেট করে। হনুফা বানু নিজেই মনে মনে একটু হাসে।

“কি রে তুই বলে গায়ে হলুদ, ফটোগ্রাফী, ভিডিও গ্রাফী আরও কী সব বলে…. তার জন্য তোর বাবার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চেয়েছিস”? হনুফা বানু মেয়ের নীরবতা দেখে নিজেই প্রসঙ্গ টা তুলেন।‌

“মা মাত্র পাঁচ লাখ চেয়েছি, বেশী তো চাইনি। ধরো আমি যদি বিয়ে না করে তোমাদের সাথে আরও পাঁচ বছর কাটিয়ে দেই তাহলে কী পাঁচ বছরে আমার জন্য তোমাদের পাঁচ লাখ টাকা খরচ হবে না!! ” হাতের কাপটা টেবিলে রেখে আঙ্গুল গুনে গুনে বলে।

“তোর বাবা টাকার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, চেহারার দিকে তাকানো যায় না, আর তুই বলছিস মাত্র পাঁচ লাখ!!”, হনুফা বানুর যেন বিস্ময় কাটে না। মেয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। হিরণময়ী নির্বিঘ্নে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।….(চলবে)

 

লেখক পরিচিতিঃ-

লেখক ডি. এম. কামরুজ্জামান স্বাধীন।

পিতা আব্দুল করিম দেওয়ান তাঁর জীবনে চলার পথের আদর্শ। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ছিল‌ প্রবল আগ্রহ। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার ছায়া‌সুনিবির নিভৃত পল্লী কেয়াইন গ্রামে ১৯৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে বাল্য জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে মাদ্রাসা শিক্ষায়। সেখানে মন বসাতে না পেরে অতঃপর আবার প্রাইমারী স্কুলে ফেরত। দূরন্ত কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতে।‌

স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় “বাংলাদেশ শিশু একাডেমী” থেকে প্রকাশিত “শিশু পত্রিকায়” বর্ষা‌ সংখ্যায় প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়।

শিক্ষা-জীবনঃ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কুচিয়ামোড়া থেকে এস.এস.সি, তেজগাঁও কলেজ ঢাকা থেকে এইচ.এস. সি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেন।

পেশাঃ একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সেলস্ ডিপার্টমেন্টে কর্মরত আছেন।

পছন্দঃ খেলাধুলা, বই পড়া, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো ও সাহিত্য চর্চা করা।

রচনাবলীঃ দেশের স্বনামধন্য অনেক শিল্পী লেখকের রচিত গানের কথায় গান গেয়েছেন। ইউটিউবসহ অনেক অনলাইন প্ল্যাপফর্মে লেখকের লেখা গান এর ভিডিও অডিও দেখা ও শোনা যায়। লেখকের অসংখ্য কবিতা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নাটকের স্ক্রিপ্ট, গানের ভিডিও স্ক্রিপ্ট, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া ও গান রচনা করেন।

পুরস্কারঃ বিভিন্ন অনলাইন সাহিত্য সংগঠন ও সাহিত্য পত্রিকা থেকে অসংখ্য সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন।